বিস্ময় পোকা

আমাদের ঘরে একধরনের ঘুণপোকা আছে
কাঠের তৈরী কোনো কিছু ওর আহার্য নয়
দিন কি রাত্রি, বিকেল গড়ানো স্বপ্নের ঘরে
আকাঙ্ক্ষাপুর থেকে দক্ষিণে অভিমানঘাট
পেরিয়ে দাঁড়াই অসম্পন্নপাড়ের মেলায়
ওদের নীরব উপস্থিতির কানাঘুসা তবু বিশ্রামহীন

আমি নিজগুণে পরিপার্শ্বের স্পন্দন থেকে
শিখে নিতে চাই অলৌকিকের ঘরসংসার
ফুলের সঙ্গে ভালবাসা করে ভুলে যেতে চাই
ঝাঁজরা পাঁজরে ক্যাকটাসের ঘা
চাইলে কি হয়? বিস্ময়বোধে শুধু বাড়ে জ্বালা
পালিয়ে বেড়াই ইট-পাথরের কাঠিন্য থেকে

গাঁয়ে ফিরে গেলে আজও ডুকরায় দুখী বাসিন্দা
আড়চোখে দেখে জামার ভেতর ঘুণপোকাদের
                                 ভালবাসাবাসি
পরবাসী হয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবো
                                 আর কতকাল!
উপর

বিরামহীন পথে

(কবি শামসুর রাহমান শ্রদ্ধাস্পদেষু)


অঢেল শস্যের পাশে
কাঁটাঘাস উঠেছিলো ঘরসংসারের আঙিনায়
কর্ষণের আগে মাটি কেঁপেছিলো খুব।

কেমন অসহ্য যন্ত্রণার বুকে
উদার আকাশ নীল ছোঁড়ে-
মাটি স্বাস্থ্যবতী হয়, ধুরন্ধর কাঁটার শরীরে
ভালবাসা ও নিন্দার যতো খুশি মধুচিনি মাখে!

সমুদ্রের তলদেশ থেকে এ নীলের যাত্রা শুরু
বিরামহীন পথে অগ্নিময় বারুদের দিকে।
সমুদ্রের নীল আর আকাশের নীল একাকার-
মাঝখানে ধুপছায়া বকুলের বনে কেউ কেউ
পীতরঙা জামা পরে উঁকি দেয় সৃষ্টিমুখী পথে!

মসৃণ বাগানে এই কালে রঙিন প্রজাপতি
মুক্তির ডানায় আজও খেলা করে,
বাতাসের বুকে তাঁর সাদা ঝুঁটি ওড়ে
নীলসমুদ্রের ঢেউয়ের মতো।
উপর

পদ্মা

এমন বিরহ আজ সবাইকে দু'দণ্ড কাঁদায়
কাঁদতে না পেরে কেউ নির্বিকার কপালের দোষে!

কোন্‌ দ্রোহী কেড়ে নিল বাহারি প্রমত্তা সেই ঢেউ!
বুকের গভীর থেকে উঠে এসে ওই সুর আর
বাজে না, বাজে না তার নূপুরের শব্দে জলসিঁড়ি!
ধু ধু বালুচর যেন মরীচিকা হয়ে তড়পায়
অগ্নিকাণ্ড লজ্জা পায় প্রতিদ্বন্দ্বীহীন প্রজ্বলনে
রঙ্গপটু আগুনের হল্কা আজ তাই পরাজিত
                        নিজেই নিজের কাছে।

বিরহ যাতনা তার- সীতা যেন একা বনবাসে
মেঘনাদ হননের হাতিয়ার নেই আজ আমাদের হাতে
নিঃশেষের নীল বাতি পড়ে থাকে অসহায় হয়ে
পতঙ্গের কী যে হবে অন্ধকারে, ভ্রষ্ট অন্ধকারে!
উপর

কোথায় কে জানে

দু'পাশে পাহাড় মাঝখানে শুধু সফেদ বরফ
পাহাড়ের গায়ে ঢালুতে গড়ায় দুঃখের নদী
এরই পথ দিয়ে আমি হেঁটে চলি
আমার গাত্র লুফোলুফি করে ঘন কুয়াশার ন্যাংটা শরীর
বিকট ঠাণ্ডা হিমায়িত করে রক্ত-মাংস
আদি সৃষ্টির দুই ডানাঅলা দুই পতঙ্গ
আমাকে দেখায় অলিগলি পথ

আমার পেছনে ভালুকের মতো একটি জন্তু
                    তাড়া করে ফেরে
এই বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে
দাঁড়াবার কোনো অল্পস্বল্প মুহূর্ত নেই
দুই পতঙ্গ আমাকে বলেছে, দাঁড়ালে হঠাৎ
জড়িয়ে ধরবে অপমৃত্যুর এক সুগন্ধী মায়াময় লতা
পাথর মূর্তি হয়ে থেকে যাবো বরফের দেশে
দুই পতঙ্গ আমাকে বলেছে, অবিরাম পথে
বীর্যপুরুষ নীরবে দাঁড়িয়ে সেনানীবিহীন
যে আমার ভাই অথবা কেবল অবিকল আমি

তাই ছুটে চলি অনাদিকালের কোথায় কে জানে...
উপর

বিষণ্ন নির্জনে

নাগরিক বেশে তোমাকে পেয়েও
কী এক সমুদ্র পেরনোর দুর্নিবার আকর্ষণে
আমার নোঙর ছিঁড়ে অথৈ যাত্রা ছিলো
             দিগ্বিদিক সান্ধ্য পথে-
জলের অতল ভেবে এতদিন
কুয়াশার অন্তর্বাসে ঠোক্কর খেয়েছি

ডুবসাঁতারের কারুকাজে খুব পারদর্শী ছিলে
আমাকে না পেয়ে তুমি বারবার
            খোঁজাখুঁজি করে ক্লান্ত ঘুমের ভেতর
কুমারী মাতার স্বপ্ন
তোমার সে নীতিবোধকেই ক্রমাগত লজ্জা দিল

এই বৃদ্ধ পৃথিবীর অনুতাপদগ্ধ সঙ্গ ছেড়ে
শুধু শ্রাবণের ধারাজলে ভেসে
            তোমাকে খুঁজেছি কত পথ
রাধিকার গানে বুঝতে পেরেছি
শূন্যতাকে ভালবেসে পূর্ণতাকে ভুলেই ছিলাম

সেই খেদ নিয়ে তুমি ইদানীং
আপাদমস্তক এক অন্তর্লীন বৃক্ষ হয়ে আছ
শয্যাসহ নাগরিক বিষয়-আশয় সঙ্গ করে
আশ্রয় নিয়েছ সেই ভয়ঙ্কর বিষণ্ন নির্জনে
উপর

চন্দ্রবিহার

এক.

খণ্ড মেঘেদের শরীরে বেজে ওঠে আলোর ঝলকানি
ঘোড়ার পিঠে চড়ে নবমী চাঁদ ছোটে
ঘুমটা টেনে টেনে তারারা উঁকি দিয়ে বলে যে কত কথা
ফুলেরা ঘুমচোখে নীরবে শুধু ফোটে

দুই.

চাঁদের বেগে আমিও ছুটি সমান তালে
ধরতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে তাকাই ফিরে
একলা আমি পড়েই থাকি রেললাইনে
দেয় কি ধরা চাঁদের আলো কাচের হীরে

তিন.

কালবৈশাখে দুরু দুরু বুকে লুকোই আঁধারে
ভাবি, চাঁদ এসে ফিরে যাবে না তো
অনেক দিন তো কিশোরী জোছনা মেখেছি শরীরে
জোছনাই আজ মেখে নিক তবে আমার শরীর
উপর

তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়

স্বপ্নের ভেতর দেখি তুমি এক আশ্চর্য আকাশ
আমার মধ্যাহ্নে এক সূর্য মেলে ধরো
আমিও তোমার সূর্যে স্নান করে
আবার প্রত্যুষকালে ফিরে যেতে চাই

আমার স্বপ্নের ঘোর কেটে গেলে
তোমার তাপের এক লহমায় পুড়ে হই ছাই
এমন তাপের দম্ভ শুষে নিতে চৌরাস্তার মোড়ে
মেলে ধরি দিনযাপনের ডালা
উড়ন্ত বকের ডানা আদ্যোপান্ত আমাকে শেখায়
			আকাশের ভালবাসা
সমুদ্র উত্তাল ঢেউ তুলে আমাকে সহিষ্ণু করে
ঝড়ের তাণ্ডব বেসামাল হয়ে
	আমাকে উড়িয়ে নেয় অজানার পথে
তোমার যে ওড়ে শুধু ফিনফিনে শাড়ির আঁচল
আঁচলের দোলা লেগে ঝড় আরো তীব্র হয়ে ওঠে
সেই ঝড় বয়ে যায় পাথর-দালান ভেঙে ভেঙে
তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়...
উপর

চাঁদনি রাতের গল্প

(কাজী হাফিজ প্রীতিভাজনেষু)


কে যেন বাসা বাঁধে রাত্রি পড়ে এলে আমার ঘরে
ও চাঁদ! তুমি তার সাক্ষী থেকো-
তোমার বৈরাগী আলোর ঝিল থেকে নামিয়ে দিও
রাত্রি জেগে থাকা বকের ডানা
নীরবে সারারাত রঙিন ছোটমাছ ধরার ছলে
আমার শরীরের ওপর যত খুশি পাহারা দেবে।

একাকী ঘরে থাকি এ যেন ঘন বনে হারিয়ে যাওয়া
রাতের পর রাত ঝরায় হাহাকার বংশীধ্বনি
কী এক কামনার আগুন জ্বলে তার লগ্নবোধে
ও চাঁদ! তুমি তার সাক্ষী থেকো-
জলের সিঁড়ি ভেঙে সে ধ্বনি এলোমেলো অন্ধকারে
		 গুল্মকায়া হয়ে শরীর ছোঁয়
কিছুটা গলে যাই, গলে যে যেতে হয় মোমের মতো।

ও চাঁদ! তবু তুমি সখ্য গড়ে নিলে মেঘের সাথে
ঈষৎ উঁকি মেরে জানিয়ে দিলে
তোমার চেয়েও সে অনেক সুন্দর।
উপর

দৃশ্যত আমি নেই

শরীরের জলভারে নুয়ে পড়া কামদেহ
বহুদিন ধরে রাখে লেফাফার আবরণে
সহিষ্ণু পাথরের মতোই সে ইদানীং
আমাকে যে ফিরে চায় দু'দিনের মৌবনে

মৃত্তিকা টানে শুধু জ্যামিতিক মমতায়
ঘুঙুরের ধ্বনি তাই লুকিয়েছে সেই কবে
মনে হয় ফিরে গেছে সন্ধ্যার ঘুম থেকে
বালিয়াড়ি পথ বেয়ে পাপহীন শৈশবে

জানালার ফুটো দিয়ে গলে পড়ে ওমরোদ
দৃশ্যত আমি নেই নির্জন বাড়িঘরে
সময়ের ফুলগুলো ঝরে গেছে অসময়ে
নেগেটিভ রিল থেকে সবকিছু মনে পড়ে

চর আছে নদী নেই চোখ আছে জল নেই
তাই আজ চার চোখে শূন্যতা ফুঁসে ওঠে
ঘর আছে বাড়ি আছে দৃশ্যত আমি নেই
পারে যদি এঁকে দিক চুম্বন কোনো ঠোঁটে
উপর

অসুখ-আঁধার

নরকবাসের সময় ফুরোলো না এখনও! দেখি-
স্বর্গবাসের শুরু বহু আগে আমাদের ঘরে
মৃতবৎ পড়ে আছে!
নরম ওষ্ঠযুগলে খরার মাতম মেতেছে
চুম্বনে তেড়ে আসে নাগিনীর বিষ!

মধ্যরাতের গুঁড়িবৃষ্টির ঠাণ্ডা নদীতে
তুলসীতলার রাধারাণী ভেসে আসে,
পূর্বপুরুষ পালিয়ে বেড়ায় বিহ্বল চোখে;
নিত্যদিনের আসা-যাওয়া সাথী চন্দন কাঠে পোড়ে।

মোমের কলমে এরকম ছবি এঁকে
ক্রুদ্ধ জননী অসুখ আঁধারে শুধু শুয়ে থাকে
আলেগোছে ছিঁড়ে যায় মমতার জাল
এপাশ ওপাশ থেকে ঘুরে আসে প্রেতিনীর হাত!
উপর

পরোয়ানা

নিরিবিলি শুয়ে থাকার সময়
জটিল সীমানা থেকে জটাময় পথে
একটি অদ্ভুত শ্বেতপত্র এলো
	 আমার অস্তিত্বে
মাটির শীতল বুক ফেটে গেল
কোনো বাঁশঝাড় থেকে কয়েকটি পরিপক্ব বাঁশ
খণ্ড খণ্ড হয়ে বিলাপ করলো

হিজল গাছের শাখা থেকে
একটি সুন্দর পাখি
মধ্যআকাশের কষ্ট বুকে নিয়ে
উড়ে গেল দূরে-
একবারও ফিরে তাকালো না
একটি রঙিন ফুল হেলে পড়লো মাটি ছুঁই ছুঁই
(সেই মাটি ছুঁতে পারলো কি পারলো না
অবশ্য তা কোনোদিন জানতেও পারি নি)

পাশের বাড়ির কিছু লোক এসে
বললো, কী আছে পত্রে লেখা?
কবেই বা এলো ওই পত্র?

দোকানের লোকগুলো দাঁড়িয়ে রইলো নির্বিকার
অনুতাপ করে কেউ বললো, আহারে!
কতদিন দেখি নাই তারে
এতদিন মনে হয় ছিল পরবাসে!

তাইতো! কিঞ্চিত চোখ তুলে তাকালাম
আমি কি তাহলে এইমাত্র জন্মালাম?
পৃথিবীর সব আলো এইমাত্র আমাকে দেখলো?
আমার নীরব অস্তিত্বের অবসরে
ওই মাটি ফেটে গেল
বাঁশ খণ্ড খণ্ড হলো
দু-তিন গাঁয়ের সকল মানুষ
আমাকে দেখতে জড়ো হলো!
উপস্থিত লোকদের নেতৃত্ব দেবার জন্যে এক
		 দক্ষ পুরোহিত এলো
মৃদু গুঞ্জনের সাথে তাই ভেসে এলো
		অচিন পথের গন্ধ!

আমার মা কাঁদে, কাঁদে আমার স্ত্রী-কন্যা
ঘরের বারান্দা থেকে সকরুণ সুর ভেসে আসে
তা কি আযানের ধ্বনি, নাকি কারো নির্মম বিলাপ!

এত কান্না কখনও শুনি নি
এত লোক কখনও দেখি নি
এত বড় আয়োজন কখনও হয় নি
আকাশের ভাঙাচাঁদ নেমে চুপি চুপি বলে গেল-
		আজ যে তোমার জন্মদিন
পাখিগুলো পত পত করে উড়ে এসে বলে গেল-
		আজ যে তোমার জন্মদিন
নদীর প্রবাহ ছল ছল শব্দ তুলে বলে গেল-
		আজ যে তোমার জন্মদিন
পৃথিবীর সবফুল মৃদু গন্ধ ঢেলে বলে গেল-
		আজ যে তোমার জন্মদিন

অতঃপর ধূর্ত দুই ডানা মেলে
	কাছে এলো ঈশ্বরের হাত
হাতের তালুতে ধীরে গড়িয়ে গড়িয়ে উঠলাম
		 সুউচ্চ পিঠের স্বর্ণসিংহাসনে
ঈশ্বরের দুর্নিবার দ্রুতপথে
আমার তাৎপর্য ব্যাখ্যা হতে না হতেই
হাজার হাজার স্যালুট পড়লো
		আমার উদ্দেশে

সাদা-কালো কিন্তু স্বচ্ছ কাচের দেয়ালে পড়ে থাকে
		পরবাসী জীবনের কাগজ-কলম...
উপর

প্রত্যাশা

(সোনিয়া সালামের উদ্দেশে)


সফেদ বরফের জমাট তলদেশে মাছেরও সুখ নেই
এসব দেখেশুনে সুখের পালকটি সহসা একদিন
শীতের পাখি হয়ে দখিনে উড়ে যায়!

শীতল বুক থেকে অনেক দূর পথে দখিনে উড়ে এসে
মধুর বাসা বাঁধে স্নিগ্ধ আয়োজনে
রোদের জরায়ুতে আবারও একদিন
ফসলি অভিসার জন্মে ধীর লয়ে
সন্ধ্যে হয়ে এলে শঙ্খ বেজে ওঠে কালের মন্দিরে
পুরনো শ্লোকগুলো মন্ত্র হয়ে জ্বলে
জ্বলতে বাধা নেই, নেভাতে তাড়াতাড়ি অন্য শ্লোক নেই

এমন আগুনের উৎস খুঁজে পায় সাধ্য কারো নেই
জানে না সে পালক কি রঙ আগুনের জ্বলে বা কতটুকু
অনেকদিন পরে একটি লেফাফায় পত্র ঘরে এলে
শুকনো পাতাগুলো অল্প নড়ে ওঠে
সুখের পালকটি উঠানে বসে থাকে

কপালে টিপ পরে আবারও শুরু হয় দীর্ঘ প্রত্যাশা-
উপর

একটি জন্মতিথি

লক্ষ মানুষ খালি পায়ে হেঁটে যখন পৌঁছে
ফুল পাহাড়ের ওই পাদদেশে
আমিও সেখানে চুপি চুপি এসে
একটি ফুলের কানে কানে বলি-
ওদের নিকট থেকে এনে দাও একটি জন্মতিথি
সেইদিন আমি ফুটিয়ে হাজার রক্তগোলাপ
অহংকারের শতমালা গেঁথে সাজাবো বছর
বর্ণমালার প্রত্যেক বাঁকে জন্মাবে সেরা বীর সন্তান
জন্ম এবং জন্মান্তর থেকে উঠে এসে
শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে মায়ের শিথানে!

সকল মা-ই তো ছেলের জন্যে ভয়ে ভয়ে থাকে
দেখো নি সেদিন ছেলের মাথায় এক হাত রেখে
মা বলেছিলো, ও বাছা, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবি তো?
ওই ছেলেটির মা ছিল লক্ষ মায়ের মতোই,
লক্ষ মায়ের প্রতিনিধি যে মা, ওই মা যেদিন
পিচঢালা পথে রক্তগোলাপ রঙ মেখেছিলো
সেদিন মায়ের চোখে শ্রাবণের ধূসর আকাশ
			ভেঙে পড়েছিলো
সে দিনটি ছিলো একুশে ফেব্রুয়ারি।

তারপর কোনো এক একুশের ভোরে
একটি হলুদ কাঁচা গাঁদাফুল কাছে এসে বলে
বায়ান্ন থেকে একাত্তরের মুক্তির শেষে
পেয়ে গেছি তার নিখাদ জন্মতিথি
সেটাই নীরবে বাসা বেঁধে আছে প্রতি বাঙালির হৃদস্পন্দনে।
উপর

মালীর চোখে ঘুম

এক.

শুধুই মেঘমালা আকাশ ভেঙেচুরে বর্ষে গর্জনে
এ বেলা মালী এসে ও বেলা বসে থাকে,
নিজের সঞ্চয়ে যতনে দুধবাটি ফেলবে কর্ষণে
কোথায় দেবযানী? লুকিয়ে কোন বাঁকে?

হঠাৎ একদিন মালীর কাছাকাছি দাঁড়ালো দেবযানী
সূর্য সে সময় লম্বা ছায়া দিলো,
অনেকদিন পরে মালীর চোখে সেই ঘুমের ঝলকানি
মালীর দেহখানি আড়াল করে নিলো।

দুই.

সূর্য দিন দিন দখিনে হেলে পড়ে
পৃথিবী চুপচাপ বলে না কোনো কথা
লম্বা ছায়াগুলো লম্বা আরো হয়
প্রাচীন দু'টি দাঁত পূর্ব-পশ্চিমে দেয় যে চিৎকার
কষ্ট চেতনার এমন হাহাকারে টিকে কি সভ্যতা!

তিন.

দাঁড়িয়ে দেবযানী, জাগে না সেই মালী
হাসে না ফুলগুলো, বাগানে নুয়ে আছে-
উপর


বৈপরীত্য

(তপন বাগচী প্রিয়বরেষু)


আকাশের বুক ফুটো করে ওই রোদ হেলে পড়ে
নিরুপায় হয়ে
নিরুপায় হয়ে বৃষ্টির ধ্বনি উড়ন্ত মেঘে উন্মাদ হয়
বারান্দা থেকে
বারান্দা থেকে ঘরে এলে তবু শীতের কাঁপন বাসা বাঁধে ধীরে
পাখিদের মতো
পাখিদের মতো শীত কি গ্রীষ্মে তৃতীয় দৃষ্টি উড়ে যেতে চায়
প্রিয় নাম ধরে
প্রিয় নাম ধরে পরদেশী পথে গলা ছেড়ে গায় বিরহের গান
রোদসী দুপুরে
রোদসী দুপুরে ধুলো মাখা গায়ে আমিও দাঁড়িয়ে নীরবে শুনেছি
অনেক সময়
অনেক সময় বকের মতন নিজের শরীরে ফিরে চেয়ে দেখি
বৃষ্টি ফোঁটা
বৃষ্টির ফোঁটা লেগে আছে যেন স্নান সারা এক বালকের মতো
উদোম শরীরে
উদোম শরীরে পশুরাও থাকে কখনো কখনো মানুষের মতো
সভ্য সমাজে
সভ্য সমাজে মানুষেও থাকে কখনো কখনো পশুদের মতো
সবুজের বুকে
সবুজের বুকে গ্রীষ্মে যেমন টিন ফাটা রোদে হঠাৎ বৃষ্টি
উথালপাতাল
উথালপাতাল বৃষ্টির দিনে নষ্ট সময়ে রোদ ঝিকিমিকি
এখানে সেখানে
এখানে সেখানে দিনের ভেতরে নিত্য নিঝুম আঁধার লুকিয়ে
কী এক বৈরী
কী এক বৈরী রাতের আঁধারে আলোর বসতি আলোর বসতি
আলোর বসতি...
উপর

পর্যায়ক্রম

এক.

একদিন সবকিছু পেয়ে যাবো শোন খুকু
বললাম অপরূপ কিশোরীর উদ্দেশে
দেখে নিও উজ্জ্বল চাঁদ-আলো আসবেই
তাই আমি পেতে দিই শরীরের সবটুকু

দুই.

সাঁতরে পার হবার আগে কেন বলো না
তোমার আলো কাজল হয়ে চিতিয়ে ছিলো
সত্যি করে বলোতো তুমি, একটি বারও
উষ্ণ করে আমাকে পাবে ভেবেছ কিনা

তিন.

শিমুল তুলোর উড়োউড়ি দেখে নাকে ধরে যায় খিল
তবু সেই পথে আসা চাই খুব কানা ভিখারির মতো
আমাদের পথ আমাদের থাক খোলা আকাশের নীল
এই কথা বলে অনায়াসে চলে ভালবাসাবাসি যতো

চার.

পা দু'টো নড়বড়ে রয়েছে বলেই তো হাঁটতে পারছো না
হাঁটতে পারছো না এমন চরাচরে আমার ছায়াপথে
স্বপ্নে পাখা মেলে উড়ছি দেখো আমি উচ্চ পাদদেশে
তুমিও উড়ে চলো আমার হাত ধরে মুক্ত মনোরথে
উপর


আলো থেকে অন্ধকারে

(খালেকুজ্জামান পিকলু বন্ধুবরেষু)


শত শত বছরের দুঃখ-বেদনা ও
দুর্গন্ধ লাশের যোগফল রাত্রি!
তা না হলে রাত্রি এতো অন্ধকার কেন?

হাজার বছর আগে পলায়নপর এক যুবা
		আমাকেই বলেছিল-
লাল-নীল স্বপ্নপুরে দ্বিতীয় জীবন
		অঢেল উজ্জ্বল বর্ণ,
উল্কার ডানায় চড়ে আকাশ ভ্রমণ
কিংবা ফুলবাগানের মালীর বুকের ঘন কালো
লোমশ শরীরে অবগাহনের মুহুর্মুহু তৃপ্তি,
অথবা কখনও প্যারাসুটহীন মহাশূন্যে ভেসে
কিছু নক্ষত্রের মালা গেঁথে ওই মালীকে পরানো
কিংবা রাধিকার অবিকল মূর্তি নিয়ে
কৃষ্ণের আশায় বিবস্ত্র অপেক্ষা-
এইতো এভাবে বেশ থাকা যায়- নিভৃতে আনন্দে!

যারা প্রতি রাতে এইভাবে ভেতরের বারান্দায়
	দ্বিতীয় জীবন উপভোগ করে,
যারা দিন থেকে শুধু পালিয়ে বেড়াতে ছুটে চলে
জমকালো অন্ধকার অভিমুখে,
আগুনের গনগনে বুকে
পতঙ্গের আত্মাহুতি নাকি মানুষের
	সেই অপারগতার কাছে শেখা,
তা না হলে দিন থেকে পালিয়ে বেড়াতে
ওরা কেন ছোটে আগুনের জিবে
ওদের সকল মেকি জীবনের আহাজারি শুধু
আমার নিষিক্ত দম্ভে শিহরণ তোলে

ওদের সকল কর্মদায় যেন আমার একার!
উপর


মূক-অপেক্ষা

(গাজী ইকবাল ও নিম্মিকে)


নিকষিত রাত থেকে একফালি কষ্ট শুধুই
আমাকে কাঁদায়-
বান্ধবহীন মনটি আমার অগ্নিদগ্ধে মরে
জীবনের শেষ সংলাপ ঝরে পড়বে কখন
পূর্ব ফাগুনে খাবি খাবে এই পথ হারা মন
রোদ ছাই হবে নিজে পুড়ে পুড়ে
আমার মধ্যে এসব চিন্তা ঘুরপাক খায়!-

নির্জনে বসে থাকার স্বভাব
উবে গেছে যেন সেই কোন কালে
কোলাহল থেকে কোন এক ফাঁকে নির্জনে চেয়ে দেখি
চতুর্থবার আহ্বান ধ্বনি এখনও বেজেই চলে
তবু তোমাদের এই ফলবতী মূক-অপেক্ষা
আমাকে আবারও ধ্যানরত করে তোলে
মাথা উঁচু করে দেখি পৃথিবীটা তাই বেঁচে আছে।
উপর

তিন পুরুষের সংসারে

আগুন রঙের কলস জড়িয়ে কাঁখে
যেমনি নদীর তীরে অমলিন মিলায় কন্যা
ঠোঁটের আড়ালে মুচকি হাসির আহাজারি ঝরে!
আহা! সবটকু বিশ্বাস যদি এমনি মিলিয়ে যেত,
দু'দিন পরেই তবে তার দেহ নিলাম হতো না।

তাই নদীতীরে পাহারা বসিয়ে গঞ্জের মাঝি
তার মাল্লাকে বলে উঠতো না-
চারদিক কালো আঁধারের ঘনঘটা।

মাঝি মাল্লারা বৈঠাসমেত হাতে তোলে স্টেনগান
বলে, হুঁশিয়ার... সাবধান... কালো আন্ধার আজি!

সব কন্যার নাকের নোলক তাই
তিন পুরুষের সংসারে শোভা পায়!
উপর

কোনদিকে যেতে চাও

সমুদ্র বন্দর ভেবে কষ্টের রসদ বুকে নিয়ে
নোঙর করলে স্বপ্নের জাহাজ
জলশব্দহীন একা
	আমার সৈকত অভিমুখে-

থরোথরো কম্পমান সঞ্চিত বালির সমতলে
চন্দ্রালোকে পীতবর্ণ লতাগুল্ম বুনে
		একাকী করেছি চাষ!
অতি ধীরে নেমে এলে
দেখবে মেঘের রঙে শুষ্কপ্রায় বালির দেয়াল
সাগরের ঢেউ থেকে ছুটে আসে প্রমত্তা কিশোরী
পায়ের যুগল চিহ্ন এঁকে ভাঙে
		সেই দেয়ালের এক অংশ।
নৈর্ব্যক্তিক গর্ভিনীর মতো সৈকতের তীর ঘেঁষে
সে কিশোরী বোনে সবুজ চত্বর!
সেই চত্বরের একদিকে থাকে
	মমতার জালবোনা বিপুল ভাণ্ডার
অন্যদিকে ধুকপুক হৃদয়ের ক্লিষ্ট অন্ধকার
বালির সৈকত বয়ে নেমে যায় গভীর সমুদ্রে-

তুমি কোনদিকে যেতে চাও?
উপর

হেসে ওঠে বহুদিন পরে

বরফের বুক থেকে কেউ এসে
কিছু উষ্ণতার খোঁজে পাখির পালক হয়ে ঝরে
ঘূর্ণি খেয়ে শব্দশূন্য অচিন পাতার সঙ্গী হয়...

ঘোড়ার দাপট-খুরে লম্বা ছায়া আরো লম্বা হয়
রাত্রির চোখের শান্তমণি খুঁজে পায় না ওসব।
তবে কেন সূর্য জ্বলে ওঠে নারকীয় জোছনায়?
অশ্বারোহী তীরন্দাজ বড় ক্লান্ত হয়
পিপাসায় ছাতি ফাটে তার
তবু চায় সে বিজনে সমাকর্ষী শরীরের ভাষা!
ক্ষণে ক্ষণে ছুটে এসে ঘুরে যায় অবেলার পথে
কখনো আবার চাঁদ নামে তার অবশ শরীরে।
তুমুল সংগ্রামে মেতে সে শরীর বাহারি খোলসে
সিংহের শাবক খুঁজে ফেরে সিঁড়িভাঙা অন্ধকারে!

এইসব দেখে দেখে একদিন-
পাতা ও পালক তৃপ্ত হয় কোনো বালিকার হাতে
	অগ্নিপিণ্ডে মুখোমুখি হেসে ওঠে বহুদিন পরে।
উপর

তোমাকে ভালবেসে

দরজা খোলা পেয়ে পাহাড় হেলে পড়ে ঘরে
হয়তো এইভাবে এসেছ ছবি হয়ে-
পাথর ভেঙে ভেঙে গভীর তলদেশে তোমাকে খুঁজি ফিরি তাই!
পাহাড় শুধু বলে, পাওয়ার চিৎকার এমনি যদি হয়
কিভাবে চুপ থেকে আকাশে শুয়ে থাকি
এতো যে ভালবাসা ছড়িয়ে ওই ঘরে
নিজেকে হারাবার হৃদয়ে তোলপাড় ধ্বনি!

প্রেমিক পাহাড়ের এমন কথা শুনে
তোমাকে খুঁজে ফিরি অন্য কোনোখানে
জলের ঢেউ ফেলে অতলে থাকো যদি
কেমন করে বলো তোমাকে খুঁজে পাবো পাহাড় কেটে কেটে?

অথচ কথা আছে বাঁধবে বাসাটুকু
আমার এই বুকে উজানে চলে আসা
		 ভাগ্যলিপি তুমি;
আমিও দ্বিধাহীন তোমাকে ভালবেসে হয়েছি ঘরছাড়া।
উপর

কী যে ভুল ছিল

কী যে ভুল ছিল শুরু থেকে-
এসব ভাবতে প্রায় তিন যুগ গেল।
ভেনাসের কাটা দু'টি হাতের মতন
গ্রাস করে নিল অদৃশ্যের পথে।
সাতঘাটে নিরিবিলি, জলের নাচন নেই আর
কেননা ঘুঙুর বাজা শরীরের সবটুকু তার
		চিতার আগুনে পোড়ে।
বুঝেছি এ পথে ছিল সুখহারা নীল অন্ধকার
সময়ে ফেরার এক গোপন চুক্তির পথে দেখি-
সারি সারি বেদনায় পূর্ণ বনভূমি
ফুলের রঙিন মরা পাপড়ির অঙ্গ মধুহীন
হা-হুতাশে মরুভূমি, সেও হার মানা তাপহীন।

কী যে ভুল ছিল শুরু থেকে-
ও পথের আঙিনায় কাঁটঝোপ, বড় অসময়
এ পথের জটাজালে সময় অতীত
		- বলো কোন পথে যাই
কী যে ভুল ছিল শুরু থেকে-
উপর


আবার ফিরে যাবো

(গল্পকার হুমায়ুন মালিককে)


একদিন এক জ্যোৎস্না রাতে শঙ্কা শরীরে
আমাকে ফিরিয়ে দিলে-
বৃক্ষসমেত কেঁপে উঠেছিল উল্কার জিভ;
ঝর ঝর করে ঝরে পড়েছিল পাতা ও বাকল
খুব কেঁদেছিল লজ্জিত ফুল।

ওদের সে ভাষা বুঝতে না বুঝতেই
অবুঝের মতো শূন্যে পালালে।

যতবার আমি নির্জনে যাই
ততবার ঝরে উন্মাদ সেই পাতা ও বাকল
মাতাল পাখির ছিন্ন পালক আমাকে পোড়ায়!
নিজের মাথায় পরাজিত হাত, অপেক্ষা করি!

জবাবদিহির বিকেলের ছাদে
আমিও দগ্ধ সংকোচ ছুঁড়ে দেবো-
আবার মানুষ হয়ে ফিরে যাবো মানুষের মানুষের কাছে!
উপর

তবে কেন আজ

ডানা ভাঙা এক পাখির মতন
হাহুতাশ করে দিনরাত যায়,
আকাশে ওড়ার স্বপ্ন-সাধের কথা
সম্প্রতি বলা হয় না মেঘের কাছে!

মেঘেরা নামবে, এই প্রতীক্ষা করে
ভাঙাডানা মেলে স্থির বসে থাকি
	খোলা আকাশের নিচে।
এখনতো আর যাওয়া হয় না গোপন গুহায়
স্মৃতিগুলি শুধু ছবি হয়ে আছে
এই হৃদয়ের নীল অভিধানে।

প্রবাস দিনের তোমার আকুতি
অখণ্ডে চির ধরাবার কোনো কারণ ছিল না
তবে কেন আজ হৃদয় ঘরের ইট খসে পড়ে
নিষেধের রেখা টপকে বেরোয় সীতা
আপন কক্ষ ছেড়ে ধাবমান সূর্য ছড়ায় সুতীব্র আলো!

আমার আকুতি তোমাকেই ঘিরে, তবু
মৌচাকে ঢিল ছোড়ার সুখই যে তোমার আলাদা!
উপর

জমকালো রাত

ঘরের জানালা খোলা রাখলেও
ঢুকবে না রাতে কোনো আকাঙ্ক্ষার আলো
সকালের ঘুমভাঙা বারান্দার বিবস্ত্র শূন্যতা
প্রতিদিন তাই হাহাকার করে।

হঠাৎ করেই দেখি ইদানীং
বিড়ালেরও চোখে নামে জমকালো রাত।
আঁধার-খাঁচার মধ্যে গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল
বন্দি হয়ে থাকে শরীরের ভাঁজে।
ভরা কলসের জলে পিপাসা মেটাতে
দু'জনেই কেঁদে মরে এক ঘরে-
এমন কান্নার জলে আগুনের তেজ আরো বাড়ে।
উপর


নিরন্তর চেয়ে থাকা

(কথাশিল্পী রফিকুর রশীদ শ্রদ্ধাভাজনেষু)


এই রাত কী সন্ন্যাস মাখা অন্ধকার
ফুরিয়ে যাবার আগে অহঙ্কারে মুখ ফেরায় না।
দিনের শরীরে ছোটে বাক্সবন্দি রাতের অধর
ছেঁড়া অংশ কিছু জমা রেখে যায় জানালার পাশে।

রোদেলা বর্শার ফলা বরাবরই তিরিক্ষি মেজাজে
ভুরভুর ভুঁইফোড় হয়ে ওঠে,
ছেঁড়া অংশ শুষে শুষে খায়!

রাত যদি লম্বা হতো যুগের সমান
তবে আলোকের সন্ত্রাস হতো না-
রাতের আলোর রূপ হতো বেড়ালের
		দুই চোখের মতন!
- হতো কেন! আঁধারে তো বেড়ালের কিছু চোখ থাকে,
যেমন দিনের আলোতেও কিছু অন্ধকার থাকে!
এইসব বেড়ালের চোখ বা দিনের অন্ধকার
দেখতে তৃতীয় চোখ থাকা চাই!

গহন বনের ঘাস দু'মুঠোয় চেপে ধরে আছি
সন্ন্যাস বায়ুর তীব্র থাবা থেকে নিজেকে বাঁচাতে
এক হাতে বিষ বাটি নিয়ে
তৃতীয় চোখের দিকে চেয়ে থাকি!
উপর

নীলছায়া বনে

শেষ রাতে কেঁদে ওঠে সমুদ্রের ঢেউ
আবার কি তার গর্জে ওঠার প্রস্তুতি!

মায়াবন ছেড়ে নীল দু'টি ছায়া পালিয়ে বেড়ায়
কষ্ট-বৃষ্টি ঝর ঝর করে ঝরে পড়ে সারাদিন
মায়ার বাঁধন যেন টুটে যায় অনেক দিনের
জল ছল ছল ক্ষীণ কণ্ঠে ঝরে যায়
		প্রব্রজ্যার পারিজাত!

কঠিন দুঃসময়ের মুখোমুখি সৃষ্টি ও ঈশ্বর
নিরন্তর আধফোটা জলজ শিশুরা নীল চোখে
			শেষবার নড়ে ওঠে।
জলের ভেতর থেকে কচি মুখে বলে-
এমন সমুদ্রে এইবার নয়
আবার কখনও যদি হাতে আসে একটু সময়
প্রকৃতির অটোগ্রাফ নিতে দেখা হবে
		সেই নীলছায়া বনে!
উপর

সুন্দর থেকে খসে যাবে

এত বেদনার ডালপালা যদি দ্রোহী হয়ে ওঠে
নতুন শস্যের শিষগুলো তবে পুড়ে হবে ছাই
বৃক্ষ দাঁড়াবে দীর্ণ আকাশে
পাখিরা পালাবে দূরে বহুদূরে।

যে আঙুল দিয়ে কোনো সন্ন্যাসী মৃদু ইশারায়
সন্ধিপত্র রচনা করেন,
পাথর সিঁড়িতে ঘষে হয় সেই আঙুল বিমূঢ়!
দাগকাটা ঘরে সিংহ-দরজা ভাঙতে ভাঙতে
ভোরের আকাশে সূর্য উঠলে
চোখের পাপড়ি খসে পড়ে যায় আপনার হাতে!

এত কষ্টের মুহূর্তগুলো যদি হয়ে ওঠে মৌন বিলাপ
সুরের বাগানে ফুলগুলো তবে হাসবে না আর
টবগুলো ভেঙে হবে খান খান
সুন্দর থেকে খসে যাবে লাল!
উপর

মা যে বড় খুশি হন

মাটিও পাথর হয়- মা যখন
নোনাজলে আয়নার মতো দেখেন নিজের মুখ!
মাটি আর অনড় শিলার মতো
কঠিন সংঘর্ষে আমিও ছিলাম মেতে;
শব্দ হোক বা না হোক, অল্প কিছু কথা হয়েছিলো
উবু হয়ে আগুন কাঠের মাঝখানে মুখোমুখি।
শত্রু ও শত্রুতা ভাব বিনিময় করে পালায় না-
সমুদ্র শাসন তুচ্ছ করে সম্মুখে চলার পথে
		মনে পড়ে বিধবা মায়ের মুখ!

আগুনওতো ছাই হয়- যখন মা পাথরের মতো!
সারারাত জেগে শীতের ভেতর
একা একা তোলপাড় করি নদী, পাহাড়-পর্বত!
চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে নয়মাস যুদ্ধ হলে
পৃথিবীর তাবৎ সভ্যতা বাঁচে-
মা যে বড় খুশি হন দেখে।
উপর

এমনই যে দেখতে হয়

খ্যাপা পাগলেও রৌদ্র মেঘে ডাকে কোকিলের ডাক

আমি শুধু চেয়ে দেখি ছবির আকাশ
নীল আঁচলের প্রান্তে টলোমলো পায়ে
খেলা খেলি কালো জোছনায় বাউল বাগানে!
ডাল থেকে ডালে হাঁটি, ভুল করে পথে
মরীচিকা হয়ে থাকি কখনো বা তৃষিত মাটিতে
আমি কি তাহলে শূন্যে গড়েছি ঠিকানা!

কোনোদিন যেন কারো নজরে না পড়ি
কাচের আদলে থাকি কিশোরীর বুকে!
নিখুঁত আবৃত বুকে চেয়ে দেখি
	কাঠঠোকরার নিরন্তর কর্মযজ্ঞ!

এমনই দেখতে হয় হাবাগবা মানুষের মতো
দখলিস্বত্বের আজ বড় কালদিন!
উপর

রাতের নিয়ম এই

নিশ্চিতভাবেই ছিল রাতের আঁধার
গাছের পাতার ফাঁকে ছিল শিরশির হিমবায়ু
বরফের অনুভবে ফুসে উঠেছিল সিক্ত মাটি
পায়ের পাতায় ছিল কালো বেড়ালের নিঃস্বশব্দ
থেকে থেকে কুকুরের সকরুণ দীর্ঘ দীর্ঘ ডাক
কয়েকটি দাঁড়কাক গাঢ় নীরবতা ভেঙেছিল

গত রাতেও তো ছিল আঁধার শায়িত
আজ কাকভোরে চোখ মেলে দেখি-
আঁধারের একদিকে ঘুমিয়েছে দিগন্তের রেখা
অন্যদিকে কুয়াশায় ঋণগ্রস্ত দীর্ঘ করিডোর
আকাশ পিছিয়ে গেছে অনেক দূরের অন্তরালে
আজ ধর্মঘট হবে, বলে দিল আমার কলম
কাগজের সাদা বুক হয়ে পড়ে ধু ধু মরুভূমি
ঘুম এসে ভর করে আমার দু'চোখে

রাতের নিয়ম এই- বলে গেল দিকচক্রবাল...
উপর


শব্দহীন বোধে

(হামিদ রায়হান স্নেহভাজনেষু)


জননী দাঁড়িয়ে আছে কোলে নিয়ে এক কালপুত্র;
কাকে ছোঁবে বৃত্ত থেকে হাত দু'টি সহসা বাড়িয়ে?

দিন গেছে অগণন, পথ থেকে অনুজ্জ্বল পথে-
গন্তব্যের সীমানায় ঝুলকালি মাখা অষ্টপদী
দিবারাত্রি নির্বান্ধব গড়ে তোলে ভুতুড়ে রাজত্ব।
পাহাড়ের ভোর থেকে অসংখ্য জীবাশ্ম ফুরিয়েছে
			আদিগন্ত নীল ছুঁয়ে;
জড় ও জটিল লতাপাতা ঘিরে আছে
	ফুলতোলা বালিকার নম্রহাত।
তবু জননীর কোলে কালপুত্র-
কাকে ছোঁবে হাত দু'টি সহসা বাড়িয়ে!

কাল এসেছিল পথহারা এক পাখি
আজ ডানা জুড়ে নেমে এলো তার বিষাক্ত ছোবল
এ দু'দিনে বদলে গেছে সবই, শুধু বাকি
জননী ও কালপুত্র।
উপর

দূরগামী হও

সাগরের বুকে নৌকার মতো ভেসে কি কখনও
গভীরের নীলে পৌঁছানো যায়?
পৌঁছানো যায় আলাস্কা হয়ে সাইবেরিয়ায়?
মৃত্তিকা থেকে আকাশের নীলে কিংবা তুষারে
পুষ্প-গন্ধে বিরুদ্ধ হয়ে মানুষের কাছে
শীতসকালের হিমেল বাতাস পেরিয়ে সেখানে
যেখানে সূর্য অক্ষবৃত্তে ছড়ায় রুদ্র?

এই বাড়িটার চারপাশে আছে সবুজ বাগান
সাতটি তারার মেলবন্ধনে সুন্দর ঘর
তার ভেতরেই মুকুট পিয়াসি আমি দিনরাত
সবকিছু এই আমার মধ্যে বাসা বেঁধে আছে
তবু কেন তুমি খুঁজে নিতে এত দূরগামী হও!
উপর

তুমিই বলো

স্বপ্নছোঁয়া আমন্ত্রণে ত্যাজ্য করে গৃহস্থালি
কেমন করে আসবো বলো-
যাবার পথে কাঁটার বাধা বিছিয়ে রাখো
তারচে' ভালো আমার ঘরে তোমার বাধা অল্প কিছু
ফেরার পথে আমার হাতে বিষের বাটি
দেখছো না কি?
এমন বাধা পেরিয়ে যেতে তোমার কিছু বিদ্যে আছে
দু'জন শুধু তাকিয়ে আছি পরস্পরে
সগৌরবে হঠাৎ করে একটি আলো রুমাল মেলে
রাঙিয়ে দিলে দোষ কি কারো তুমিই বলো-

তবে কি ওই রুমালটিকে ক্রুদ্ধ তুমি কীট বলবে?
উপর

কালো জোছনায় পড়ন্ত বিকেল

কোনো একদিন রোদেলা বিকেলে
তোমার দীঘল ছায়া পড়েছিল আমার শরীরে
এমন অবগাহনে ঘনীভূত আমি
অমরত্ব নিয়ে ভাবনায় মশগুল
		লোকাচার থেকে দূরে

তুমি যে কখন চলে গেছ
এটা বুঝেছি তখনই
যখন রাত্রির ঘুম থেকে
সদ্য উঠে আসা কালো জোছনায়
	 ভরে গেছে পড়ন্ত বিকেল
উপর

এত ভার বয়ে যাই

গভীর রাতের ঠোঁটে
থমকে পড়া থোকা থোকা রক্ত
	আজও লাল হয়ে আছে।
সমুদ্র, গোধূলি, আকাশের নীল ছুঁয়ে
বেদনা-কাতর বোধে ক্রমশ নিঃশ্বাস ছুটে যায়
		আধখোলা ওই দরজার দিকে।

একুশ বছর থমকে পড়া মাঠ
আবার সবুজ হয়ে উঠবে কষিত পদভারে-
তবুও রক্তাক্ত লাল দীন করে রাখে লোকাচার।

দেখেছি জাতির পিতার রক্তের স্রোত বয়ে গেছে
		অর্ধ-সিঁড়ি থেকে বঙ্গোপসাগরে;

এত ভার বয়ে যাচ্ছি
	বয়ে যাবো-
	যতদিন মানচিত্র থাকে!
উপর

পথ ফিরে পায় কেউ

বলেছিলে তুমি আসবে আবার, তাই
হঠাৎ শব্দে আকাশ ভেঙ্গে আবারও বৃষ্টি নামে
লাউয়ের কাঞ্চা ডগার হিমেল ফাঁকে।
বলেছিলে তুমি আসবে আবার, তাই
শীতের পাখিরা আবারও যে ফিরে এলো
এবার সহসা ফিরে চলে যাবে বলে।
এই বারবার আসা ও যাওয়ার শ্রম
ক্ষত হয়ে বিঁধে আমাদের সেই একান্ন সংসারে।

কাল এসেছিল এ বাড়িতে এক পথহারা পাখি
ডানা জুড়ে তার লেখা ছিল চিঠি
আবার ধুলায় মিলিয়েছে যেন দূর কোনো পথে
হলো না তো পড়া
শুধু শুধু আমি পথ চেয়ে থাকি-

পথ ফিরে পায় কেউ
আবার হয়তো কেউ কেউ পথ হারায় আঁধারে।
উপর

অন্য রকম অন্য জিনিস

চারদিক থেকে গোধূলি রাঙিয়ে আমার ওপর
যে ভর করেছে, সে আমার কেউ নয়,
অথচ আমাকে সাতটি রঙে সে
তাড়িয়ে বেড়ায় সাত পাকে ঘোরা মোহনার দিকে।

কোনো মৌনতা বিন্দুমাত্র তাকে নিরস্ত্র করতে পারে না,
তবু আমি শুধু রেললাইনের মতো পড়ে থাকি
অসীম ভালবাসায়-
মুহূর্তে সরে যাবো এতে বড় লজ্জা আদিম!

খুব দুর্বল এই হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢোকে
নিজ সৃষ্টিতে মাতোয়ারা হয় ময়ূরের মতো,
অথচ সবাই জানে সে আমার আর কেউ নয়,
কোনো আত্মীয় নয়, নয় কোনো বন্ধু সুজন।

পা অবধি চষে বেড়ায় কী এক সৃষ্টির খোঁজে-
পা আমার নড়ে ম্যাজিশিয়ানের বাক্সের মতো।
তবু পড়ে থাকি, যদি সে-ই এসে বলে-
তোমার উৎসে রেখে যাবো আমি
বিকল্প এক সভ্যতা জেনো!
যদি বলে তুমি থাকো আরো কিছুদিন-
না হয় ফলাবে অন্যরকম অন্য জিনিস!
উপর

দুই জোড়া চোখ

সন্ধ্যার দিকে মুখ ফিরিয়েছি বলেই কি আজ-
শঙ্খের ধ্বনি পাখির স্বভাবে পালক ঝরায়?
মাটির আঙুল গলিয়ে জলের সিঁড়িতে দাঁড়ায়
		সেই দুই জোড়া কালো চোখ!

সন্ধ্যার সারা শরীরে কামের ধারালো ছুরিটা
কত পতঙ্গ আর লোভাতুর আয়ু বধ করে!
রোজ প্রত্যুষে হিসেবের সাদামাটা খাতা থেকে
		শুধু আমি বাদ পড়ে যাই।

পাথর-নিথর এক ধ্যানী বোধিবৃক্ষে আগুন জ্বলে ওঠে
মোমের আঁধারে শীত কি গ্রীষ্মে থরথর পুড়ি!
জলের সিঁড়িতে সেই দুই জোড়া কালো চোখ তবু
		ঘুম-ঘোর ফাঁদ পেতে রাখে।
উপর

হায়রে স্বপ্ন

এই গহ্বরে জমা ছিল এক স্বপ্নের খনি
কাউকে বলি নি, নীরবে পুষেছি সারাটা জীবন
স্বপ্নকে নিয়ে দিনরাত শুধু ভেবেছি একাকী
	পারি দেবো এক ভস্মের স্তূপ
একরাশ আশা বুকে চেপে ধরে
	 খামোখা ছিঁড়েছি অষ্টধর্ম
এই স্বপ্নেরা তবে কি বোঝে না আত্মার গান
শীত-মৌসুমে লেপ-তোষকের ওম জড়ানোর
			ভাষাও বোঝে না
কোনো স্বপ্নের গিঁট খুলে গেলে মমতার বেণী
		হাহাকার করে, কেঁদে হয় খুন
হায়রে স্বপ্ন! কোথাও হারিয়ে পেলো কি সত্যি
			মিথ্যের ফুল

হায়রে স্বপ্ন! স্বপ্নের সাথে স্বপ্নের এক প্রাসাদ গড়ার
		স্বপ্নটা হলো শুধুই স্বপ্ন!
উপর

প্রকাশনা

সূচিপত্রসহ কবিতা

আলোচনা

বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিবেদন

Copyright © 2005 – 2006 sskobita.com All rights reserved   ||   Site designed by Byte Technologies