কায়সুল হক

দাঁড়িয়ে থাকবেন তিনি

কবি জীবনানন্দ দাশের 'সকলে কবি নয়, কেউ কেউ কবি' উক্তিটি মনে রাখলে আমরা কবি ও কবিতার প্রতি সুবিচার করবো। এবং কবিকে মনে রাখতে অনুরোধ করবো যে, কবি শ্রমিক ও একই সঙ্গে পথিক। শব্দ আর চিন্তার সচলতা তার পথ তৈরির রসদ। কবিকে আরও মনে রাখতে হবে, শব্দ এবং চিত্রকল্পের ব্যবহারের দক্ষতা কবিকে এনে দেয় সফলতা। 'তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়' কবিতায় সুমন সরদার নিজের ইচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়েছেন নির্ভুল ছন্দে। সেজন্যে পাঠকের মনে আশা জাগে যে তিনি কবিতার জগতে দাঁড়িয়ে থাকবেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থের নামও রেখেছেন 'তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়'।

             কবি সুমন সরদার তাঁর কবিতার শরীর নির্মাণে যত্নশীল। যেমন-

              "সাতঘাটে নিরিবিলি, জলের নাচন নেই আর

              কেননা ঘুঙুর বাজা শরীরের সবটুকু তার

                                     চিতার আগুনে পোড়ে।

                                           (কী যে ভুল ছিল/তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়)

কিংবা,

               "সকালের ঘুমভাঙা বারান্দার বিবস্ত্র শূন্যতা

              প্রতিদিন তাই হাহাকার করে।"

                                   (জমকালো রাত/তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়)

এ রকম বেশকিছু পঙক্তি পাঠকের চোখে পড়বে যা কিনা কবির প্রতি আগ্রহী করে।
(উত্তরপুরুষ, প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত)

* কায়সুল হক পঞ্চাশ দশকের বিশিষ্ট কবি ও সাংবাদিক।

উপর


খালেক বিন জয়েন উদ্‌দীন

তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড় : স্বপ্নলোকের হাতছানি

কবিতাকে নিয়ে অনেক কথা, অনেক বিতর্ক, অনেক সমালোচনা। 'কবিতা কেন লিখবো'- এমন বক্তব্যও রেখেছেন কেউ। কবিতাকে নিয়ে এই বিতর্ক বা আলোচনার বা সমালোচনার শেষ নেই। মানুষ যতদিন কবিতা পড়বে বা ভালবাসবে, ততদিন এই ব্যক্তিক কথাবার্তা থাকবেই। পক্ষ-স্বপক্ষের এ লড়াই চলবে চিরকাল।

মননে কবিতার স্থান কতটুকু, তা কোনো কবিই বলতে পারেন না। কবির কল্পনা বা অনুভূতিই তাঁর প্রধান অবলম্বন। পাঠকের কাছে যা গ্রহণীয়, তাই মননে গেঁথে যায়। বাকিটুকু বর্জ্য। চিরকালের জন্য হারিয়ে যায় অপকৌশলে গড়া তথাকথিত কাব্য-পদাবলী।

কবিতার বিষয় কি হবে? এরকম প্রশ্ন আগেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। কবি কোন শ্রেণীর পাঠকের জন্য কাব্য নির্মাণ করবেন, এটা কবির ব্যক্তিক চিন্তা-ভাবনা। কবি যদি নিজেকে শিল্পশ্রমিক মনে করেন তাহলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর লাভবান হবার কথা। কারণ কোনো শিল্পই শ্রমের বাইরে সৃষ্টি হয় না।

সুমন সরদারের কবিতা পড়ে আমার মনে হয়েছে তিনি একজন শিল্পশ্রমিক। বহু কষ্টে বাবুই পাখির মতো খড়কুটো জোগাড় করে একটি মনোরম বাসা তৈরি করেছেন যেখানে নিভৃতে-নিরলে শান্তিতে থাকা যায়। তাঁর বাসার খড়কুটোগুলো এতো নিপুণ যে কালবোশেখির ঝড়ে দোলার বা পড়ে যাবার কোনো সম্ভাবনা নাই। কারণ তাঁর গাঁথুনি এতো মজবুত যে একটির সঙ্গে অন্যটির মিল সরস্বতির বরে উত্তীর্ণ।

সুমন সরদারের কবিতার আমি একজন ভগ্ন পাঠক। 'তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়' পড়ার পরে আমি তাঁর পাঠক হয়ে উঠি। হৈ চৈ করে তাঁর কবিতা পড়া যায় না। একটু সময় নিয়েই তাঁর কবিতা পড়তে হয়। কারণ তাঁর কবিতার শরীর নির্মাণ সহজে বোঝা যায় না। কলাদেবীর সব কাব্যকৌশল সুমন তাঁর কবিতায় ধরে রাখতে চান। কবিতা সম্পর্কে কবির অনুভূতি যতই উচ্চকিত হোক না কেন- এ ক্ষেত্রে সুমন বড়ই শান্তশিষ্ট। তিনি যেন শব্দ-উপমা আর কাব্যকৌশল দিয়ে নিজেকে পর্দার আড়ালে রেখে সশরীরে প্রকাশিত হন।

শোক-দুঃখ-বেদনা আর জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষণই মানুষকে বিচলিত করে। এক্ষেত্রে কবির দায়-দায়িত্ব এড়ায় না। কখনও প্রকাশ্যে কখনও আবডালে থেকে তাঁর কর্ম সম্পাদন করতে হয়। কারণ কবি অত্যন্ত সচেতন ব্যক্তি এবং সমাজের বাসিন্দা। সুমন সরদারের কবিতা পড়ে আমার লাভবান হতে হবে- এমন আশা নিয়েই সময়কে ধরে রেখেছি তাঁর জন্য। যখন পড়ি-

                          "গাঁয়ে ফিরে গেলে আজও ডুকরায় দুখী বাসিন্দা

                          আড়চোখে দেখে জামার ভেতর ঘুণপোকাদের

                                                               ভালবাসাবাসি

                          পরবাসী হয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবো

                                                               আর কতকাল!"

                                                   (বিস্ময় পোকা/তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়)

নিজেকে এভাবে দুখি ভাবার কী যে আনন্দ, তা সকলে বোঝে না। তিনি যখন আবার লেখেন-

                          "কোনো একদিন রোদেলা বিকেলে

                          তোমার দীঘল ছায়া পড়েছিল আমার শরীরে

                          এমন অবগাহনে ঘনীভূত আমি

                          অমরত্ব নিয়ে ভাবনায় মশগুল

                                                   লোকাচার থেকে দূরে"

'কালো জোছনায় পড়ন্ত বিকেল' এ কবিতাটির প্রথম স্তবক বড়ই সুখের কিন্তু পরবর্তী স্তবকে দেখি ওটা শুধু স্বপ্ন। তখনই মনে হয় কালো জোছনায় একজন কবির স্বপ্নবিহার।

এ গ্রন্থের শেষ কবিতাটিও স্বপ্নকে নিয়ে। বিরূপ বিশ্বে মানুষ মূলত: স্বপ্নচারী। একজন কবির ক্ষেত্রে তা আরও বেশি প্রকট। সুমন স্বপ্নালোকের যে বাসিন্দাই হোক না কেন, আমাদের স্বপ্নের কথা তাঁর কবিতায় থাকতে হবে। যখন দেখবো তাঁর কবিতা পাঠে আমার প্রাপ্তি লোকসানের দিকে- তখন আমি বিমুখ হবো- হয়তো পড়বোই না তাঁর কবিতা। আর এজন্য তাঁর কিচ্ছু যায় আসে না। কারণ এটা কেবল কবিই জানেন।

(উত্তরপুরুষ, প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত)

* খালেক বিন জয়েন উদ্‌দীন, বিশিষ্ট শিশু সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।

উপর


হুমায়ূন মালিক

'তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়'
বৈরীসময়ে সাহসী অঙ্গীকার

বলা যায় কবিতার ইতিহাস হচ্ছে তার বিষয়াঙ্গিকের বিবর্তনের ইতিহাস। কবিকে এই বিবর্তনের অভিজ্ঞতা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। তাঁকে ধারণ করতে হয় সময়ের চরিত্র এবং তা থেকেই তিনি নিজের জগৎ তৈরি করেন।

আপন স্পৃহা অনুযায়ী সেখানে তার বৈশিষ্ট্য পরিস্ফুটিত হয়ে ওঠে। সুমন সরদার নব্বই দশকের কবি। বিষয়াঙ্গিকে তিনি এ সময়ের কবিতার চরিত্রকে সফলভাবে ধারণ করেছেন। তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্যই তাঁকে চিনিয়ে দেয়। সুমন সরদারের কবিতায় স্বচ্ছ বক্তব্য সুশৃঙ্খল আঙ্গিকের ভেতর বিশেষ এক শৈল্পিক ঘোর নিয়ে সংস্থাপিত-

                          "তবু জননীর কোলে কালপুত্র-

                          কাকে ছোঁবে হাত দু'টি সহসা বাড়িয়ে!


                          কাল এসেছিল পথহারা এক পাখি

                          আজ ডানা জুড়ে নেমে এলো তার বিষাক্ত ছোবল

                          এ দু'দিনে বদলে গেছে সবই, শুধু বাকি

                                                 জননী ও কালপুত্র।"

                                                              (শব্দহীন বোধে)

নব্বই দশকের গোড়া থেকে দেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিনে সুমন সরদারের কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। এরই মধ্যে তাঁর তিনটি (আলোচ্চ গ্রন্থটিসহ) কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থগুলো যথাক্রমে 'বিপন্ন বসবাস' (১৯৯৫), 'আগুন রঙের ডানা' (১৯৯৬) ও 'তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়' (১৯৯৯)। 'তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়' প্রথম ইন্টানেট প্রকাশনা হিসেবে ১ ফেব্রুয়ারি '৯৯ থেকে বিশ্বব্যাপী প্রচার (URL : www.netblitzinc.com/book) হয়।

'তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়' বিষয় বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। ছন্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রেও কবির দক্ষতা ও বৈচিত্র্য লক্ষযোগ্য। কিছু কিছু উপমা উৎপ্রেক্ষা রূপকল্পে তাঁর সৃষ্টিশীল ক্ষমতার পরিচয় মেলে-

                          (১) ভেনাসের কাটা দু'টি হাতের মতন

                              গ্রাস করে নিল অদৃশ্যের পথে

                                                  (কী যে ভুল ছিল)

                          (২) আমাকে ফিরিয়ে দিলে

                                    বৃক্ষসমেত কেঁপে উঠেছিল উল্কার জিভ

                                                  (আবার ফিরে যাবো)

ঘাতক, বন্ধ্যা, মৌলবাদের চোরা স্রোতাক্রান্ত সময়ের বিরুদ্ধে সুমন সরদারের একটি সুস্পষ্ট অবস্থান-দৃঢ় অঙ্গীকার আছে। কিন্তু তাঁর কবিতা তত্ত্ব কিংবা স্লোগান আক্রান্ত নয়। তবে সুমনের কবিতা পাঠকের বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। যেমন-

                          "গহন বনের ঘাস দু'মুঠোয় চেপে ধরে আছি

                          সন্ন্যাস বায়ুর তীব্র থাবা থেকে নিজেকে বাঁচাতে

                          এক হাতে বিষ বাটি নিয়ে

                          তৃতীয় চোখের দিকে চেয়ে থাকি!"

                                                 (নিরন্তর চেয়ে থাকা)

'তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়' গ্রন্থে বেশকিছু প্রেমের কবিতা ঠাঁই পেয়েছে। সে সব কবিতার শিল্পিত বোধ হৃদয়কে গভীর ভাবে আলোড়িত করে-

                          "সন্ধ্যার সারা শরীরে কামের ধারালো ছুরিটা

                          কত পতঙ্গ আর লোভাতুর আয়ু বধ করে!

                          রোজ প্রত্যুষে হিসেবের সাদামাটা খাতা থেকে

                                                 শুধু আমি বাদ পড়ে যাই।"

                                                 (দুই জোড়া চোখ)

সুমন সরদারের 'তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়' কাব্যগ্রন্থে পূর্ববর্তী কাব্যগ্রন্থের ক্রম উত্তরণের বিবর্তন চোখে পড়ে। এ ভাবেই তাঁর কবিতা এ সময়ের চরিত্রকে ধারণ করে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর-

                          "অতঃপর ধূর্ত দুই ডানা মেলে

                                     কাছে এলো ঈশ্বরের হাত

                          হাতের তালুতে ধীরে গড়িয়ে গড়িয়ে উঠলাম

                                                 সুউচ্চ পিঠের স্বর্ণসিংহাসনে

                          ঈশ্বরের দুর্নিবার দ্রুতপথে

                          আমার তাৎপর্য ব্যাখ্যা হতে না হতেই

                          হাজার হাজার স্যালুট পড়লো"

                                                 (পরওয়ানা)

নব্বই দশকের বিশিষ্ট কবি সুমন সরদারের 'তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়' পাঠকের কাছে বিশেষ অভিনিবেশ দাবি করে। তবে তাঁর কবিতায় অহেতুক জটিলতা সৃষ্টির কোনো প্রয়াস নেই। তিনি তাঁর উপলব্ধিকে সুচারুভাবে প্রকাশ করেছেন মাত্র।

গ্রন্থটির প্রচ্ছদ, বাঁধাই ও ছাপা চমৎকার। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জায় শিল্পী নাজিব তারেক।

(১৭ নভেম্বর ২০০০ তারিখে চট্টগ্রামের 'দৈনিক পূর্বকোণ'-এ প্রকাশিত)

* হুমায়ূন মালিক আশির দশকের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক।

উপর


মীর মাহমুদ আলী

বাংলা সাহিত্যের প্রথম ইন্টারনেট গ্রন্থ
'তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়'

ফেব্রুয়ারি ১, ১৯৯৯। বাংলাদেশ সময় রাত ১২ টা ১ মিনিট। ইন্টারনেট জগতে সংযোজিত হলো এক নতুন ইতিহাস। বাংলা কবিতা প্রবেশ করলো এই অঙ্গনে। কবি সুমন সরদারের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ 'তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়' সংযোজিত হলো ওয়েব পৃষ্ঠায়। বিশ্বের যে কেউ তাঁর কম্পিউটারে w.netblityinc.com/book পাসওয়ার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে পড়ে নিতে পারেন এ বইটি।

আমেরিকার এক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের স্যাটেলাইট ব্যবহার করে বাংলাদেশের দুই তরুণ netblitzinc. প্রতিষ্ঠা করে এ আপাত: অসম্ভব কাজটি সম্ভব করে তুলেছেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিশ্বের ভাষা সন্ধিৎসুদের নিকটতর করে তোলার পাশাপাশি বিশ্বের দেশে দেশে জীবন সংগ্রামের কঠোরতার মধ্যে যাঁরা দিনাতিপাত করছেন তাঁদের নিকটবর্তী করা সম্ভব হলো এই প্রকাশনা জগতের নতুন মাধ্যম উন্মোচন করে।

নেটব্লিজ ইনক আধুনিকতম প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশের। এর কর্ণধারদ্বয় চান এ দেশকে, এ দেশের ভাষা ও সাহিত্যকে পরিচিত করতে সারা বিশ্বব্যাপী। তাঁরা আশা করেন, মানুষ ভাগ্যান্বেষণে এ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন দূর দেশে, সে দেশের মানুষের কাছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে নিয়ে যেতে। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবেই তাঁরা বেছে নিয়েছেন কবি সুমন সরদারকে। অনুধাবন করা গেছে যে, কবির কাব্য সাধনা এ সময়ের তরুণ কবির মধ্যে অগ্রণী, প্রতিভার স্পর্শ লেগে আছে যাঁর কবিতায়, সমাজের কাছে আর নিজের কাজে দায়বদ্ধ যিনি তাঁকে নিয়ে গেলেন তাঁরা ইন্টারনেট ভুবনে, ইতিহাস রচনা করলেন। শেকড়-সন্ধানী এ কবির জন্যে এটি গর্বের, আনন্দের আর নেটব্লিজ ইনক-এর জন্যে এটি সাহসের এবং অকুণ্ঠ প্রশংসার।

কবি সুমন সরদার এখন আর অপরিচিত কেউ নন। বিশ্বের লাখ লাখ পাঠক তাঁর কবিতার বই পাঠ করছেন। প্রতিদিন এ সংখ্যা বাড়ছে। কবি সুমন সরদার এর পূর্বেও অপরিচিত ছিলেন না, তবে তাঁর পরিচিতির গণ্ডি ছিল কতিপয় পত্রিকার পাঠক আর কবিতাবোদ্ধাদের মধ্যে।

কবি সুমন সরদার বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকের গোড়ার দিকে কাব্যজগতে এসেছেন। ১৯৯১ সাল থেকে বিভিন্ন পত্রিকা লিটল ম্যাগাজিনে লেখালেখির পাশাপাশি ১৯৯৫ সালে 'বিপন্ন বসবাস' কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ঘটলো বলে কবি নিজেই স্বীকার করেন। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, সমাজ দর্শন তাঁর কবিতাগুলোকে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলো। তাঁর কবিতাগুলো নজর কাড়তে শুরু করলো।

দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'আগুন রঙের ডানা' প্রকাশিত হলো ১৯৯৬ সালে। এ কাব্যগ্রন্থটি কবি সুমন সরদারকে নব্বই দশকের তরুণদের মধ্যে অবস্থানকে সুদৃঢ় করলো।

'তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়' ইন্টারনেটের পাশাপাশি গ্রন্থাকারে বেরিয়েছে ১৯৯৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। প্রকাশ করেছে একমাত্র কবিতার বই প্রকাশক বিশাকা প্রকাশনী। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী নাজিব তারেক।

তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ 'তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়' কবি সুমন সরদারকে নিয়ে গেলো আরও এক প্রশস্ত অঙ্গনে। কবি তাঁর নির্মাণ কৌশল আরও উন্নত করেছেন, আরও সচেতন হয়েছেন ছন্দে, সযতন প্রয়াসে শব্দচয়ন করেছেন, চিত্রকল্প নির্মাণে আরও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

কবি সুমন সরদারের সামগ্রিক কবিতা বিশ্লেষণ করা হয়তো সম্ভব নয়, তবে যা প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে কতিপয় বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা যায়।

প্রেম-প্রকৃতি, ক্রোধ-কাম, শূন্যতা-পূর্ণতা, ভোগ-সম্ভোগ কবি সুমন সরদারের কবিতায় অনিবার্য উপাদান হয়ে উঠেছে। কবির আকাঙ্ক্ষা এবং সংশয়-

                          "ফুলের সঙ্গে ভালবাসা করে ভুলে যেতে চাই

                          ঝাঁজরা পাঁজরে ক্যাকটাসের ঘা

                          চাইলে কি হয়!"

                                                   (বিস্ময় পোকা/তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়)

ভালবাসা, নিন্দা, বিরহ, যাতনা, দুঃখ, বিষণ্নতা কবিকে নাড়া দেয়। কবি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন এইসব জাগতিক বিষয়। কবি বারবার এই সমাজেরই একজন হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করেন। তিনি সমাজ বিচ্ছিন্ন কেউ নন। অলঙ্করণে কবি দক্ষ। 'বৈপরীত্য' কবিতায় তাঁর দক্ষতার পরিচয় মেলে-

                          "আকাশের বুক ফুটো করে ওই রোদ হেলে পড়ে

                          নিরুপায় হয়ে

                          নিরুপায় হয়ে বৃষ্টির ধ্বনি উড়ন্ত মেঘে উন্মাদ হয়

                          বারান্দা থেকে

                          বারান্দা থেকে ঘরে এলে তবু শীতের কাঁপন বাসা বাঁধে ধীরে

                          পাখিদের মতো

                          পাখিদের মতো ......."

চিত্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে কবি সুমন সরদার তাঁর কল্পনার ডানা মেলে দেন। পাঠক তাঁর কবিতা পাঠ করতে করতে হারিয়ে যান তাঁর কাব্যলোকে, মনের মধ্যে এঁকে ফেলেন এক চিত্র যেমনটি কবি চেয়েছেন-

                          "আমাদের ঘরে একধরনের ঘুণপোকা আছে

                          কাঠের তৈরী কোনো কিছু ওর আহার্য নয়

                          দিন কি রাত্রি, বিকেল গড়ানো স্বপ্নের ঘরে

                          আকাঙ্ক্ষাপুর থেকে দক্ষিণে অভিমানঘাট

                          পেরিয়ে দাঁড়াই অসম্পন্নপাড়ের মেলায়

                          ওদের নীরব উপস্থিতির কানাঘুসা তবু বিশ্রামহীন"

                                                 (বিস্ময় পোকা/তবু তুমি দাঁড়িয়ে অনড়)

কবি সুমন সরদার ছন্দ সচেতন। এই কাব্যগ্রন্থের ৪১টি কবিতা এবং উৎসর্গ পত্রের চারটি চরণ সবটাই ছন্দময়। কবি সুমন সরদার মাত্রাবৃত্তের চমৎকার প্রয়োগ দেখিয়েছেন 'প্রত্যাশা'-সহ বেশ কয়েকটি কবিতায়-

                          "সফেদ বরফের জমাট তলদেশে মাছেরও সুখ নে

                          এসব দেখেশুনে সুখের পালকটি সহসা একদিনই

                          শীতের পাখি হয়ে দখিনে উড়ে যায়।"

কবি সুমন সরদার আলো ও আঁধার নিসর্গ প্রকৃতিকে অবলোকন করেছেন। ফুল ও পাখির জগৎ তাঁর চেনা; শ্রমশীলতা, প্রেমময়তা, ক্রোধোন্মাদনা, অভিমান এবং প্রতিরোধপরায়ণতা তাঁর জানা। সহজ-সরল প্রাকৃত জীবন এবং শ্যামলিমার আকর্ষণ যেমন মানব জীবনকে স্নিগ্ধ করে তেমনি কৃত্রিম, কর্কশ, অস্বাভাবিক জীবনাচরণও তাঁর দৃষ্টিসীমার বাইরে নয়। মানুষের হৃদয়বৃত্তি ও সামাজিক সচেতনতায় সতেজ ও দীপ্ত কবি সুমন সরদার। সমকালীন সমাজের নানা অসঙ্গতি, জটিলতা, কূপমণ্ডুকতা তাঁর কবিতাকে করেছে সমৃদ্ধ।

মানুষের কল্যাণ ও সুখভোগের জন্য আমাদের সকল আয়োজন ও সকল প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা, মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং হননের দুই বিপরীত কার্যক্রম সম্পর্কে কবি সুমন সরদার সচেতন। সৌন্দর্যপ্রীতি, নিসর্গপ্রীতি, নানা উপমা-রূপক ও চিত্রকল্পের সুনিপুণ বিন্যাসে অখণ্ড ভাবমূর্তিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তাঁর বেশ ক'টি কবিতা।

প্রকৃতির রূপলাবণ্য, বৈচিত্র্যে কবি অবিভূত। এইসব ভাবপ্রবাহে কবিতার পরতে পরতে ধারণ করেছেন কবি সুমন সরদার। এভাবে কবি সুমন সরদারের বেশ ক'টি শিল্পসফল কবিতা নির্মাণে পারঙ্গমতা পাঠক-সমালোচকদের নজর বেড়েছে।

(উত্তরপুরুষ, প্রথম সংখ্যা ২০০১-এ প্রকাশিত)

* মীর মাহমুদ আলী প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক।

উপর

প্রকাশনা

সূচিপত্রসহ কবিতা

আলোচনা

বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিবেদন

Copyright © 2005 – 2006 sskobita.com All rights reserved   ||   Site designed by Byte Technologies