আবিদ আনোয়ার : ছন্দ সাঁকোতে ব্যঞ্জনাময় চিত্রকল্প-নির্মাতা

সুমন সরদার

সত্তর দশকের কবিগণের মধ্যে যে কয়জনের ছন্দের হাত বড় মোলায়েম তাঁদেরই অন্যতম আবিদ আনোয়ার। শুধু ছন্দই নয়; শব্দ চয়ন, বাক্‌-ভঙ্গি, বিন্যাস, চিত্রকল্প নির্মাণ প্রভৃতি বিষয়ে সযতন খেয়াল তাঁর কব্যে নতুনত্বের ছাপ পরিলক্ষিত। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রতিবিম্বের মমি'তেই খুঁজে পাই কবির ভাবনার জালবোনা স্বাধীনতা-উত্তর সামাজিক চৌকাঠ, যার লৌহকব্জায় আটকে আছে বাস্তবতার আশ্চর্যপ্রবণতা। এই প্রবণতাই সত্তরের কতিপয় সফল কবির হাত ধরাধরি করে কাব্যনদীর দু'পাশের বিরাণভূমিতে গড়ে তুলেছে ঐশ্বর্যমণ্ডিত পলি উপত্যকা।

কবি আবিদ আনোয়ার কবিতায় শুদ্ধতা ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে সামিল। ছন্দ, বাক্‌-ভঙ্গি, শব্দের ব্যবহার, উপমা, রূপক, চিত্রকল্প প্রভৃতি বিষয়ে তিনি শুদ্ধতম শোভা বর্ধনে নিবেদিত। এ ধরনের হার না মানা কমিন্টমেন্ট রক্ষায় নিবেদিত কবি এদেশে খুব বেশি নেই। এদিক বিবেচনায় তিনি এক অসাধারণ আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন।

প্রতিভাবান শিল্পীর শিল্পকর্মের বৃত্তে জড়িয়ে থাকে কালগত ও শিল্পগত তাৎপর্য, সচেতন মানবিকতা, মননশীলতা, নির্মিতির আধুনিকতা প্রভৃতি। এগুলিকে বিসর্জন দিয়ে কোনো কবিও তাঁর অভিপ্রায় পূর্ণাঙ্গরূপে ব্যক্ত করতে পারেন না। কেননা কবি সবসময়ই কাল ও সৃষ্টিশীলতার কাছে দায়বদ্ধ। এই দায়বদ্ধতার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছেন কবি আবিদ আনোয়ার। এর কারণ বোধহয় তাঁর জীবনপরিধিতে মিশে আছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। একমাত্র বেসামরিক বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর জীবনের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তারকারী এই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ এনে দিয়েছে সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা। এক সূক্ষ্ণ চিন্তার সুতোর ওপর ভর করে কবি আবিদ আনোয়ার এই দায়বদ্ধতার কথা প্রকাশ করেন। তাঁর কবিতা পাঠে এ সিদ্ধান্ত নেয়া কতটুকু ভুল- তা অবশ্য জানা নেই। তা না হলে অমলের বউয়ের আচরণে সামাজিক প্রাপ্তির দায়ভাগের জন্ম নিলো কি করে-

            "মরণের আগে এমনি ক'দিন

            বাঁকা হেসেছিলো অমলের বউ

            গভীর নিশিথে ডাক দিতো যাকে কদমের ডাল-

            দড়ি হাতি নিয়ে জোনাকির ভিড়ে

            বিভোর দাঁড়িয়ে সাত-পাঁচ ভেবে

            সম্বিতে ফিরে চমকে দেখতো আরেক সকাল!"

                        (বিচূর্ণিভূত স্বপ্নের ছাই /খড়বিচালির বৃক্ষজীবন)

অমলের বউকে আত্মহনন থেকে বিরত রেখেছে কে? কবিতাংশে আত্মহননে প্রবৃত্ত হওয়া এবং বারবার আত্মহনন রহিত করে আরেক সকাল দেখার এক অসাধারণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন কবি। কিন্তু আত্মহননের কারণ এবং আত্মহনন থেকে নিবৃত্ত হবার পেছনের বিষয়টিকেই কবি প্রধান্য দিয়েছেন বেশি। এখানেই সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা এসে যায় যা অন্য সুরে ভোগবাদিতা বলেও চিহ্নিত করা যায়-

            "ফেরাতো কে তাকে?

            ঝিঁঝির কান্না না কি জোনাকির প্রদীপ্ত আহ্বান :

            হয়তোবা শত গঞ্জনাতেও পেয়েছিলো কিছু সুখ,

            বেড়ালীর মতো চুকচুক করে

            চেখেছিলো সে-ও স্বামীর সোহাগ-

            হয়তো দেখেছে সিনেমা-নাটকে,

            পড়েছে গল্পে, উপন্যাসেও

            মরণার্থীকে ফিরিয়ে এনেছে প্রাপ্তির দায়ভাগ।"

                                          (প্রাগুক্ত)

কবি আবিদ আনোয়ারের কবিতায় জীবনের জয়গানের সুর ঝংকৃত। নারকীয় দুঃশাসন থেকে যুদ্ধের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়া দেশ ও নাগরিকদের জীবনের গতিধারায় চলচঞ্চল করে তুলতে চান তিনি। বেদনাবিধুর জীবনে আশার আলো উঁকি মারে তাঁর কবিতায়-এ যেন সমাজ-সংসারকে এগিয়ে নেয়ার হিরণ্ময় গলিপথ। জীবনের ট্রাজেডিবৃত্তে হাবুডুবু খেলেও ভুক্তভোগীর মানবিক চেতনাকে জাগ্রত রাখার সংকল্পব্রত গ্রহণ করেছেন তিনি-

            "যে নারী যুদ্ধের কাছে তার প্রিয় পুরুষ হারালো

            সেও ঠিকই ফিরে গেছে অন্য কোনো নায়কের ঘরে;

            জীবনের গতিধারা

            রুখতে পারে না কোনো দুর্যোগের ঢেউ :

            হলুদের ছোপ লাগা শীতের বাগানে

            যুগপৎ পাতা ঝরে, গজায় মুকুল,

            মৃতের করোটী ফুঁড়ে ফুটে ওঠে ভাগাড়ের ফুল।"

                        (কবলিত মানচিত্রে / প্রতিবিম্বের মমি)

কিংবা,

            "বিষণ্নতা ছুঁয়ে দিলো হলুদ বাড়িটাকে

            ফাটল-ধরা তক্তপোষে ঝিমোয় বসে মালিক

            কালের ধুলো-বালির সাথে বিষাদ তাকে তাকে

            বাগানে মুখ থুবড়ে-পড়া একটি মরা শালিক

            ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...

            গোরের গানে তৃপ্তি খোঁজে নতুন কোনোর্ যাঁবো

            এই বাড়িকে জিয়ন কাঠি ছুঁইয়ে কখন দেবো?

                        (হলুদ বাড়ি / প্রতিবিম্বের মমি)

এরকম নিখুঁত ছন্দোবদ্ধ চিত্রকল্প নির্মাণে তিনি সিদ্ধহস্ত। কবি আবিদ আনোয়ারের কবিতাকে তুলনা করা যায় কোনো শৈল্পিক ভাস্কর্যের সঙ্গে। কাব্য নির্মাণের ভাষা ও কৌশল চিত্রকল্পের সাঁকোতে স্থাপন করেন বলে তাঁর কবিতা পাঠককে টানে। যেমন-

            "কে এক কবি পরবে মালা ফুরফুরে সে হাওয়ায়

            না না করে নাড়ছে মাথা বুদ্ধিজীবীর মতো

            অভিজ্ঞ এক বটের পাতা; পড়লো ঝ'রেই শেষে :

            পড়বি সেতো পড়লো গিয়ে এক্কেবারে মধ্যিখানে

            ফুল-গ্রহীতা এবং সে ফুল-দাতার .....।


            হোক না ভরা আশ্বিনেই

            তবু কেমন দর্প দেখো একটি ঝরা পাতার।"

                 (একটি ঝরা পাতার দর্প / মরাজোছনায় মধুচন্দ্রিমা)

এবং

           "অবচেতনের কোথায় তবুও কদমের ঘ্রাণ পাই;

            অলীক জলের শিহরণে কাঁপে করিডোরে বনসাই-

            স্মৃতির ভেতরে পাঠশালা ভেজে, থকথকে বইখাতা :

            আমি আর সাজু- মাথার উপরে যৌথ কলার পাতা।"

                 (উত্তরাধুনিক বৃষ্টিপাত / খড়বিচালির বৃক্ষজীবন)

কবি আবিদ আনোয়ারের এরকম কবিতায় বিভিন্ন ছন্দের চমৎকার বিন্যাসে, আবেগের ইঙ্গিতময় প্রকাশশৈলীতে এক সাঙ্গীতিক সুরমুর্ছনার সৃষ্টি হয়। চিত্রকল্পময় স্তবকগুলোর দিকে পাঠকের মুগ্ধতা ধাবিত হয়, কিন্তু সাঙ্গীতিক সুরধর্ম এগুলোর চমৎকারিত্বকে ক্ষুণ্ন করে না বরং শিল্পসম্মতভাবে আলোকিত করে। এ ধরনের স্তবক নির্মাণে অসাধারণ ক্ষমতা তিনি প্রকাশ করতে সবসময়ই সচেষ্ট থাকেন।

কবিতাকেন্দ্রিক প্রবন্ধের সূচিপত্র

পরিচিতি

প্রকাশনা

কবিতাকেন্দ্রিক প্রবন্ধ

কাব্যালোচনা

ইন্টারনেটে প্রথম বাংলা গ্রন্থ

Copyright © 2005 – 2006 sskobita.com All rights reserved   ||   Site designed by Byte Technologies